বিআরটিসির ট্রাকে পণ্য, কাগজে ‘খালি’—রাজস্ব অনিয়মের অভিযোগে তোলপাড়
- আপডেট: ০৮:৪১:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১
বিআরটিসির ট্রাকে পণ্য, কাগজে ‘খালি’—রাজস্ব অনিয়মের অভিযোগে তোলপাড়
নিজস্ব প্রতিবেদক:ট্রাকভর্তি পণ্য নিয়ে যাত্রা, অথচ নথিপত্রে দেখানো হচ্ছে ‘খালি’—বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে ঘিরে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পণ্য পরিবহনের হিসাব গোপন করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিত অর্থ আদায় করত। এতে সরকারি রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থাপনায়ও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিয়মের সুযোগ।
চালকদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কয়েকটি পয়েন্টে পণ্যবোঝাই ট্রাক ‘খালি’ দেখিয়ে ট্রাকপ্রতি ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। এসব অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রতিনিধিদের কাছে পৌঁছাত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে বছরে কয়েক শত কোটি টাকা আত্মসাতের যে দাবি করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব, অডিট রিপোর্ট বা আর্থিক নথি এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে ওই অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পণ্যবাহী ট্রাক কীভাবে ‘খালি’ হয়?
বিআরটিসির চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ট্রাকগুলো চট্টগ্রামের কাফকো, টিএসপি ও ডিএপি এবং নরসিংদীর ঘোড়াশাল থেকে সার নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাফার গুদামে পৌঁছে দেয়। পরে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে চাল, ভুট্টা, আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নিয়ে এসব ট্রাক চট্টগ্রাম, ঢাকা, ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকায় ফেরে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ফেরার পথে পণ্যবোঝাই ট্রাক নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছানোর পর কাগজপত্রে ‘খালি’ দেখানো হতো। এর ফলে প্রকৃত পণ্য পরিবহন ও দাপ্তরিক হিসাবের মধ্যে গরমিল তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকত।
চালকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের করটিয়া এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের পাশে দায়িত্ব পালনকারী প্রতিনিধি মো. জসিমের বিরুদ্ধে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি পণ্যবাহী ট্রাক ‘খালি’ দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে মেঘনা-দাউদকান্দি এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের পাশে দায়িত্ব পালনকারী প্রতিনিধি মো. শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে দক্ষিণবঙ্গ থেকে আসা প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টি লোড ট্রাক ‘খালি’ দেখানোর অভিযোগ করেছেন কয়েকজন চালক।
ট্রাকপ্রতি ১ থেকে ৩ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ
শুধু ফেরার পথে নয়, বিভিন্ন লোড পয়েন্টেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন চালকের দাবি, ট্রাক লোড হওয়ার পর প্রতিটি গাড়ি থেকে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো।
তাদের অভিযোগে কাফকোতে প্রতিনিধি মো. রেদোয়ান, ডিএপি ও টিএসপিতে প্রতিনিধি মো. ইলিয়াস এবং ঘোড়াশালে প্রতিনিধি মো. নাজমুল ইসলামের নাম এসেছে।
চালকদের দাবি, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তৎকালীন চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। অবশিষ্ট অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি ও ডিপোর কয়েকজন কর্মচারীর মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ডিপোর ইয়ার্ড মাস্টার মো. আনোয়ারের বিরুদ্ধেও অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন চালক। তার ভাই মো. ইলিয়াসও কথিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তাদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
‘সিন্ডিকেট’ গঠনের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, অনিয়ম পরিচালনার জন্য তৎকালীন ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান বিভিন্ন ডিপো থেকে তার পছন্দের ব্যক্তিদের চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে নিয়ে এসে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছিলেন। ওই বলয়ে তার আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজনও ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কামরুজ্জামান ২০২৪ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ২০২৬ সালের ২৫ জুন বদলি হয়ে চট্টগ্রাম ছাড়েন। প্রায় ১৯ মাস তিনি ওই ডিপোর দায়িত্বে ছিলেন।
বদলির পরও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
চট্টগ্রাম থেকে বদলি হওয়ার পরও খুলনা থেকে কথিত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া খুলনা-ঢাকা রুটে দুটি বিআরটিসি বাস চালকের নামে নিজস্ব লোক দিয়ে পরিচালনা করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের তদন্তে কমিটি, মিলছে না নথি
অভিযোগের বিষয়ে বিআরটিসি ট্রাক ডিপো চট্টগ্রামের বর্তমান ম্যানেজার জামিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। পরে তিনি স্বীকার করেন, এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পাওয়ার পর বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একজন মেজরের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির সদস্যরা চট্টগ্রামে গিয়ে অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখেছেন।
তবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট নথি চাইলে তিনি তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। সাবেক ম্যানেজার কামরুজ্জামান তার সিনিয়র কর্মকর্তা হওয়ায় এ বিষয়ে নথিপত্র দিয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন না বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে অভিযোগকারী দুই ট্রাকচালক হানিফ ও জামালের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
অভিযোগকারী চালকেরও বিস্তারিত বক্তব্য নেই
অভিযোগকারী ট্রাকচালক হানিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ করার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে গণমাধ্যমে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে সামনাসামনি কথা বলার কথা জানান।
ফলে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করতে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, ট্রাক চলাচলের রেজিস্টার, লোড-আনলোডের হিসাব, রাজস্ব জমার রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের দায়িত্বের নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাবেক ম্যানেজারের বক্তব্য—‘তদন্তে সত্যতা মেলেনি’
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ উঠেছিল। তবে তদন্তের পর অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ব্যক্তিগত সুবিধা না পেয়ে কিছু ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন। চট্টগ্রাম থেকে বদলির বিষয়ে তিনি এটিকে নিয়মিত বদলির অংশ বলে দাবি করেন। তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে তিনি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেন।
বিআরটিসির বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বিআরটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে পণ্যবোঝাই ট্রাক নথিতে ‘খালি’ দেখানোর অভিযোগ, ট্রাকপ্রতি অর্থ আদায়ের দাবি এবং তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে—প্রকৃতপক্ষে ট্রাক চলাচল ও পণ্য পরিবহনের হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করা হতো? কার অনুমোদনে ট্রাকের অবস্থা ‘খালি’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে? কথিত অর্থ আদায়ের সঙ্গে কারা জড়িত?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে বিআরটিসির ট্রাক মুভমেন্ট রেজিস্টার, লোড-আনলোডের হিসাব, রাজস্ব জমার রেকর্ড, ফিলিং স্টেশনভিত্তিক তথ্য, সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের দায়িত্বপত্র এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নথিপত্র প্রকাশ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা গেলে সরকারি রাজস্ব ক্ষতি বা অনিয়মের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।











