সোনাতলা নদীর তলদেশের বৈদ্যুতিক তার চুরির অভিযোগ, কলাপাড়ায় চাঞ্চল্য
- আপডেট: ০৭:১২:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৩
সোনাতলা নদীর তলদেশের বৈদ্যুতিক তার চুরির অভিযোগ, কলাপাড়ায় চাঞ্চল্য
পুরোনো চুরি-ডাকাতির অভিযোগ ঘিরে আব্দুল্লাহকে নিয়ে নতুন প্রশ্ন | ট্রান্সফরমার, ট্রলার, জাল ও গবাদিপশু চুরির অভিযোগও তুলছেন স্থানীয়রা | রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ, তদন্ত দাবি এলাকাবাসীর
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আল আমিন :
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ৫ নং নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হাজিপুর বাজারসংলগ্ন সোনাতলা নদীর তলদেশ দিয়ে নেওয়া পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বৈদ্যুতিক সংযোগের তার কেটে চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র বিভিন্ন সময়ে নদীর তলদেশে থাকা বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা যেমন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তেমনি সরকারি সম্পদের ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোনাতলা নদীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক সংযোগের তার বিভিন্ন সময়ে কেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন এ ঘটনায় আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি ও তার সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া বিভিন্ন সময় প্রমাণিত হয়েছে । ফলে কারা প্রকৃতপক্ষে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
শুধু বৈদ্যুতিক তার নয়, আরও নানা অভিযোগ
স্থানীয়দের বক্তব্যে আব্দুল্লাহকে ঘিরে অতীতের আরও কয়েকটি গুরুতর অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। তাদের দাবি, অতীতে এলাকায় বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি, গবাদিপশু চুরি, জেলেদের ট্রলার ও মাছ ধরার জাল চুরিসহ বিভিন্ন চুরির ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো মামলা, জিডি, গ্রেপ্তার বা আদালতের নথি পাওয়া গেলে তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—যদি অতীতেও একই ব্যক্তিকে ঘিরে একাধিক চুরির অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কখনো তদন্ত করেছে কি না? কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
— তাকে ঘিরে অভিযোগের বিস্তার
স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি থেকে শুরু করে নদী ও খালকেন্দ্রিক জেলেদের সরঞ্জাম চুরির অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে জেলেদের ট্রলার ও জাল চুরির অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার ভাষ্য, এসব অভিযোগ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা কি না, নাকি একই চক্রের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে—তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
তাদের দাবি, পুরোনো অভিযোগগুলোর বিষয়ে জিডি, মামলা, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট থানার রেকর্ড যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগও
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, অতীতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন বলে তারা মনে করেন।
তবে এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা প্রভাব ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনের রেকর্ড এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কারও পূর্বের যোগাযোগ থাকলেই তার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয় না—এ কারণে এই অংশের অভিযোগও তদন্তসাপেক্ষ।
গণমাধ্যমকর্মীকে হুমকির অভিযোগ
সোনাতলা নদীর বৈদ্যুতিক তার চুরির অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা আব্দুল্লাহর মামা হাকিম সিকদারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গণমাধ্যমকর্মীদের দাবি, কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি “আপনি যা পারেন তা করেন” এ ধরনের বক্তব্য দেন।
ঘটনাটি সত্য হলে, অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকের সঙ্গে হুমকিমূলক আচরণের বিষয়টিও তদন্তের দাবি রাখে।
বিদ্যুৎ আইনেও রয়েছে শাস্তির বিধান
বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮-এর ৩৫ ধারায় অসৎ উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ লাইন সামগ্রী—যেমন কন্ডাক্টর, ট্রান্সফরমার বা বৈদ্যুতিক তার—চুরি, অপসারণ, বিনষ্ট বা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিসাধনকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অপরাধের জন্য ২ থেকে ৫ বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া একই আইনের ৩৪ ধারায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে কোনো বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন বা পূর্তকর্ম কেটে দেওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য ১ থেকে ৩ বছর কারাদণ্ড অথবা ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
অতএব, হাজিপুর বাজারসংলগ্ন সোনাতলা নদীর তলদেশের বৈদ্যুতিক তার কেটে নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে, ঘটনার ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রশ্নের মুখে বিদ্যুৎ বিভাগের নজরদারি
নদীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগের তার যদি একাধিকবার কেটে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে কি না—এ প্রশ্নও উঠেছে।
পাশাপাশি নদীর তলদেশের তার কাটতে কী ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে এবং কাটা তার কোথায় নেওয়া বা বিক্রি করা হয়েছে—তা অনুসন্ধান করা হলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
তদন্ত দাবি এলাকাবাসীর
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনাটি নয়, আব্দুল্লাহকে ঘিরে অতীতে ওঠা বিভিন্ন চুরির অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তদন্ত দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত নয়, বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনই হওয়া উচিত।
সামনে আরও যা অনুসন্ধানের বিষয়
এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বগুলোতে সোনাতলা নদীর তলদেশের বৈদ্যুতিক সংযোগের নথি, তার কাটা ও মেরামতের পূর্ববর্তী ঘটনা, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির রেকর্ড, স্থানীয় থানায় কোনো জিডি বা মামলা হয়েছে কি না, কথিত চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমার-ট্রলার-জালের অভিযোগের তথ্য এবং এসব অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় যাচাই করার চেষ্টা করা হবে।
তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাই এই অনুসন্ধানের মূল লক্ষ্য।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আজকের প্রথম পর্ব















