ডা. কুলসুমার তত্ত্বাবধানে সিজারের পর নারীর মৃত্যু চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ, ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের
- আপডেট: ১২:১১:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১২
ডা. কুলসুমার তত্ত্বাবধানে সিজারের পর নারীর মৃত্যু
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ, ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের
শওকত মোস্তফা :
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সিজারের পর মিতু নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন নিহতের স্বজনরা। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
পরিবারের অভিযোগ, গত শনিবার চৌদ্দগ্রামের একটি হাসপাতালে ডা. কুলসুমার তত্ত্বাবধানে মিতুর দ্বিতীয়বার সিজার করা হয়। এর আগে থেকেই তিনি রক্তস্বল্পতায় ভুগছিলেন বলে দাবি স্বজনদের। তবে অস্ত্রোপচারের আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
স্বজনরা জানান, সিজারের পরদিন থেকেই মিতুর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে ডা. কুলসুমার পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে রাত আনুমানিক ১০টার দিকে তাকে কুমিল্লা টাওয়ার হসপিটালে নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, সেখানে রাত প্রায় ১২টার দিকে তার আবার অস্ত্রোপচার করা হয়।
পরিবারের ভাষ্য, দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রোগীর পেটের ভেতরে থাকা রক্ত বা জমাট পদার্থ পরিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে কুমিল্লার মুন হসপিটালের আইসিইউতে নেওয়া হয়।
স্বজনদের দাবি, একদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন জানিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। প্রবাসে থাকা স্বামী দেশে ফেরার পর গতকাল রাত আনুমানিক ১১টার দিকে মিতুকে ঢাকার উদ্দেশে নেওয়া হলে পথেই চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
চিকিৎসা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন স্বজনদের
নিহতের স্বজনদের প্রশ্ন, প্রথম সিজারের পর কেন দ্রুত দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়েছিল, প্রথম অস্ত্রোপচারের সময় কোনো জটিলতা তৈরি হয়েছিল কি না এবং পরবর্তী চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
তারা মিতুর চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব নথি, পরীক্ষার রিপোর্ট, অস্ত্রোপচারের বিবরণ, ব্যবহৃত ওষুধ এবং চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামতের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ডা. কুলসুমাকে ঘিরে আরও অভিযোগ
নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ডা. কুলসুমার চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়ভাবে আরও অভিযোগ রয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, তার চিকিৎসায় অবহেলার কারণে অতীতেও কয়েকজন নারী রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো ঘটনায় রোগীর স্বজনরা মামলা বা আইনগত ব্যবস্থা নিতে চাইলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অতীতের এসব অভিযোগ সত্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি, মৃত্যুসনদ, হাসপাতালের রেকর্ড, মামলা বা সাধারণ ডায়েরি এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া সরকারি দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং সরকারি কর্মস্থলের বাইরে নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখার অভিযোগও উঠেছে ডা. কুলসুমার বিরুদ্ধে। পাশাপাশি বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও কোনো নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট রেকর্ড, চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনের তথ্য এবং আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
ঘটনার বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. আ. বজলুর রশীদ বলেন, “কুমিল্লার একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। ব্যবস্থা নিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যের পর সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে।
নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি
নিহতের স্বজনরা চৌদ্দগ্রাম উপজেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের দাবি, চিকিৎসায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা অবহেলা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে তারা বলেন, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, অস্ত্রোপচারের বিবরণ, পরীক্ষার রিপোর্ট, হাসপাতালের রেকর্ড এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামতের ভিত্তিতে মিতুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হোক।
অভিযোগের বিষয়ে ডা. কুলসুমা, সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।




















