চলে গেলেন ‘আপসহীন নেত্রী’—বাংলাদেশের রাজনীতিতে নীরব হলো খালেদা জিয়ার কণ্ঠ
ঢাকা, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ():
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে না–ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন ‘আপসহীন নেত্রী’ ও বিএনপির চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
সকাল সোয়া ৯টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন,
“এই সংবাদ নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতে হবে—কখনো ভাবিনি। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, আগের মতোই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু আজ ভোর ৬টায় গণতন্ত্রের মা, আমাদের অভিভাবক, জাতির এক অবিভাবক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।”
মৃত্যুর সময় বেগম খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে উপস্থিত ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবায়দা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান এবং প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছোট ভাই শামীম এসকান্দার ও তাঁর স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ স্বজনরা শেষ সময়ে হাসপাতালে ছিলেন।
এছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বেগম জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য চিকিৎসকরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। পাশাপাশি কিডনি, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও চোখের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও ছিল। হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দিলে গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশসহ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড তাঁর চিকিৎসা তদারকি করছিল। চলতি মাসের শুরুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। মামলা-মোকদ্দমা, কারাবাস, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ব্যক্তিগত আক্রমণ—সবকিছু সহ্য করেও তিনি রাজনীতির ময়দান ছাড়েননি। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে হারানোর গভীর শোক এবং দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা নিয়েও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে তাঁর জন্ম। পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ও মাতা তৈয়বা মজুমদারের কন্যা খালেদা জিয়া দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং এরপর দীর্ঘ চার দশক বিএনপির নেতৃত্ব দেন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি একটি অনন্য রেকর্ডের অধিকারী—কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি আসন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনটি আসনেই তিনি বিজয়ী হন।
চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচল প্রতীক—বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।