০২:৩৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

আপনার ধর্ম আমার পানপাত্রের সিদ্ধান্ত নেবে কেন?

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট: ০৭:৫৫:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৫৭

আপনার ধর্ম আমার পানপাত্রের সিদ্ধান্ত নেবে কেন?
লেখক: এম ডি রুম্মান হোসেন

আমি একজন নাস্তিক। আমার অবিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে চলার জন্য কোনো ধর্মবিশ্বাসীকে তাঁর বিশ্বাস ত্যাগ করতে বলি না। একইভাবে আশা করি, অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস আমার ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনার বিধান হয়ে উঠবে না। আমি কী খাব, কী পান করব কিংবা আদৌ কোনো উপাসনায় অংশ নেব কি না এসব সিদ্ধান্তে আমার স্বাধীনতারও মূল্য আছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে দুর্গাপূজা ঘিরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বক্তব্য এই প্রশ্নটিই সামনে এনেছিল। তিনি পূজামণ্ডপের আশপাশে মেলা নিষিদ্ধ করার কথা বলেন এবং এসব আয়োজনে মদ ও গাঁজা সেবনের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর ঘোষণাকে ‘পূজার সময় সারা দেশে কারও মদ্যপানের অধিকার থাকবে না’ বলে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। তবে মেলা ও জমায়েতের ওপর এমন বিধিনিষেধের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিল। দুর্গাপূজার সঙ্গে মদ ও গাঁজার আসরের সম্পর্ক টানার বিরুদ্ধেই ছিল তাদের আপত্তি। একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব নিয়ে কথা বলার সময় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভাষায় সংবেদনশীলতা থাকা জরুরি। তবে আমার আপত্তি শুধু একটি বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে ধর্মীয় চিন্তা ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস ও পানীয়ের ওপর প্রশ্নহীন কর্তৃত্ব দাবি করে, তারও সমালোচনা প্রয়োজন। কোনো ধর্মে মদ্যপান নিষিদ্ধ হলে সেই ধর্মের অনুসারী স্বেচ্ছায় তা বর্জন করতে পারেন। নিজের বিশ্বাস ব্যাখ্যা করতে পারেন, অন্যকে তা অনুসরণের আহ্বানও জানাতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগত ধর্মাচরণকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করে তোলার অধিকার তিনি কোথা থেকে পান?

আমার ধর্মের কারণে আমি মদ পান করব না’ এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ‘আমার ধর্মের কারণে আপনিও মদ পান করতে পারবেন না’ এটি অন্যের স্বাধীনতার ওপর কর্তৃত্বের দাবি। ধর্মীয় নিষেধের একটি বড় সমস্যা হলো, তা প্রায়ই যুক্তির জায়গায় আনুগত্যকে বসায়। ‘ঈশ্বর নিষেধ করেছেন’ একজন বিশ্বাসীর কাছে এই ব্যাখ্যা যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু যিনি সেই ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, তাঁর কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা কোথায়? একই দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ও অবিশ্বাসীরা বাস করলে রাষ্ট্রের বিধিনিষেধের পক্ষে এমন যুক্তি প্রয়োজন, যা যাচাই করতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করতে হয় না।

মদ্যপানের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলার অর্থ মদকে নিরীহ ঘোষণা করা নয়। জনস্বাস্থ্য, অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষা কিংবা জননিরাপত্তার প্রশ্নে নিয়ন্ত্রণের যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু প্রতিটি বিধিনিষেধের পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে; তার প্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ও সবার ক্ষেত্রে সমান। কোনো আয়োজনে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকলে কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা করতে হবে, আশঙ্কার ভিত্তি কী এবং তা মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা প্রয়োজন। পুরো আয়োজন বন্ধ করার আগে কম হস্তক্ষেপে সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না, সেটিও দেখতে হবে। ধর্মীয় অস্বস্তি বা নৈতিক বিরাগ এই ব্যাখ্যার বিকল্প হতে পারে না।
একজন মানুষ মদ পান না করেও স্বাধীন হতে পারেন। ধর্মীয় কারণে তা বর্জন করাও তাঁর স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের মূল্য থাকে তখনই, যখন অন্যের ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও স্বীকার করা হয়। বাধ্য হয়ে বিরত থাকা আর নিজের বিবেচনায় বিরত থাকা এক বিষয় নয়।

এই নীতি সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ যদি নিজের খাদ্যবিধি অনিচ্ছুক মানুষের ওপর চাপাতে চান, আমি তার বিরোধিতা করব। পবিত্রতার দাবি কাউকে অন্যের বিবেকের মালিক করে না। নৈতিকতার বিচারেও প্রশ্ন হওয়া উচিত: একজন মানুষের আচরণে অন্যের কী ক্ষতি হচ্ছে? তাঁর সততা, দায়িত্ববোধ ও অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা কেমন? শুধু পানপাত্রের দিকে তাকিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী সবাই সমান মর্যাদায় বাঁচবেন এই প্রত্যাশা অযৌক্তিক নয়। কারও উৎসবকে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি জনশৃঙ্খলার যুক্তি দেখিয়ে ধর্মীয় অনুশাসন চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।

আমার গ্লাস খালি থাকবে, না তাতে কোনো পানীয় থাকবে সেই সিদ্ধান্তে আমার বিবেচনা ও অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধ কাজ করুক। অন্যের ধর্মের প্রতি আমার আনুগত্য যেন তার শর্ত না হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

বিজ্ঞাপন: ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট এর জন্য যোগাযোগ করুন: ০১৮২৪৯০৯০১০
বিজ্ঞাপন: ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট এর জন্য যোগাযোগ করুন: ০১৮২৪৯০৯০১০

আপনার ধর্ম আমার পানপাত্রের সিদ্ধান্ত নেবে কেন?

আপডেট: ০৭:৫৫:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আপনার ধর্ম আমার পানপাত্রের সিদ্ধান্ত নেবে কেন?
লেখক: এম ডি রুম্মান হোসেন

আমি একজন নাস্তিক। আমার অবিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে চলার জন্য কোনো ধর্মবিশ্বাসীকে তাঁর বিশ্বাস ত্যাগ করতে বলি না। একইভাবে আশা করি, অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস আমার ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনার বিধান হয়ে উঠবে না। আমি কী খাব, কী পান করব কিংবা আদৌ কোনো উপাসনায় অংশ নেব কি না এসব সিদ্ধান্তে আমার স্বাধীনতারও মূল্য আছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে দুর্গাপূজা ঘিরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বক্তব্য এই প্রশ্নটিই সামনে এনেছিল। তিনি পূজামণ্ডপের আশপাশে মেলা নিষিদ্ধ করার কথা বলেন এবং এসব আয়োজনে মদ ও গাঁজা সেবনের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর ঘোষণাকে ‘পূজার সময় সারা দেশে কারও মদ্যপানের অধিকার থাকবে না’ বলে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। তবে মেলা ও জমায়েতের ওপর এমন বিধিনিষেধের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিল। দুর্গাপূজার সঙ্গে মদ ও গাঁজার আসরের সম্পর্ক টানার বিরুদ্ধেই ছিল তাদের আপত্তি। একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব নিয়ে কথা বলার সময় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভাষায় সংবেদনশীলতা থাকা জরুরি। তবে আমার আপত্তি শুধু একটি বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে ধর্মীয় চিন্তা ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস ও পানীয়ের ওপর প্রশ্নহীন কর্তৃত্ব দাবি করে, তারও সমালোচনা প্রয়োজন। কোনো ধর্মে মদ্যপান নিষিদ্ধ হলে সেই ধর্মের অনুসারী স্বেচ্ছায় তা বর্জন করতে পারেন। নিজের বিশ্বাস ব্যাখ্যা করতে পারেন, অন্যকে তা অনুসরণের আহ্বানও জানাতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগত ধর্মাচরণকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করে তোলার অধিকার তিনি কোথা থেকে পান?

আমার ধর্মের কারণে আমি মদ পান করব না’ এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ‘আমার ধর্মের কারণে আপনিও মদ পান করতে পারবেন না’ এটি অন্যের স্বাধীনতার ওপর কর্তৃত্বের দাবি। ধর্মীয় নিষেধের একটি বড় সমস্যা হলো, তা প্রায়ই যুক্তির জায়গায় আনুগত্যকে বসায়। ‘ঈশ্বর নিষেধ করেছেন’ একজন বিশ্বাসীর কাছে এই ব্যাখ্যা যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু যিনি সেই ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, তাঁর কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা কোথায়? একই দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ও অবিশ্বাসীরা বাস করলে রাষ্ট্রের বিধিনিষেধের পক্ষে এমন যুক্তি প্রয়োজন, যা যাচাই করতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করতে হয় না।

মদ্যপানের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলার অর্থ মদকে নিরীহ ঘোষণা করা নয়। জনস্বাস্থ্য, অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষা কিংবা জননিরাপত্তার প্রশ্নে নিয়ন্ত্রণের যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু প্রতিটি বিধিনিষেধের পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে; তার প্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ও সবার ক্ষেত্রে সমান। কোনো আয়োজনে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকলে কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা করতে হবে, আশঙ্কার ভিত্তি কী এবং তা মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা প্রয়োজন। পুরো আয়োজন বন্ধ করার আগে কম হস্তক্ষেপে সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না, সেটিও দেখতে হবে। ধর্মীয় অস্বস্তি বা নৈতিক বিরাগ এই ব্যাখ্যার বিকল্প হতে পারে না।
একজন মানুষ মদ পান না করেও স্বাধীন হতে পারেন। ধর্মীয় কারণে তা বর্জন করাও তাঁর স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের মূল্য থাকে তখনই, যখন অন্যের ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও স্বীকার করা হয়। বাধ্য হয়ে বিরত থাকা আর নিজের বিবেচনায় বিরত থাকা এক বিষয় নয়।

এই নীতি সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ যদি নিজের খাদ্যবিধি অনিচ্ছুক মানুষের ওপর চাপাতে চান, আমি তার বিরোধিতা করব। পবিত্রতার দাবি কাউকে অন্যের বিবেকের মালিক করে না। নৈতিকতার বিচারেও প্রশ্ন হওয়া উচিত: একজন মানুষের আচরণে অন্যের কী ক্ষতি হচ্ছে? তাঁর সততা, দায়িত্ববোধ ও অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা কেমন? শুধু পানপাত্রের দিকে তাকিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী সবাই সমান মর্যাদায় বাঁচবেন এই প্রত্যাশা অযৌক্তিক নয়। কারও উৎসবকে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি জনশৃঙ্খলার যুক্তি দেখিয়ে ধর্মীয় অনুশাসন চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।

আমার গ্লাস খালি থাকবে, না তাতে কোনো পানীয় থাকবে সেই সিদ্ধান্তে আমার বিবেচনা ও অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধ কাজ করুক। অন্যের ধর্মের প্রতি আমার আনুগত্য যেন তার শর্ত না হয়।