বিসিকে কর্মকর্তা-কর্মচারী অসন্তোষ ও অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে,,,
- আপডেট: ০২:৫৬:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৪১
বিসিকে কর্মকর্তা-কর্মচারী অসন্তোষ ও অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে
ফয়জুল ইসলাম আরিফ
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ৫ই আগস্টের পরও সংস্থাটির অচলাবস্থা অপরিবর্তনের কারনে অনেকেই হতাশ। এই প্রতিষ্ঠানটিতে বিসিএস ক্যাডারের যে কর্মকর্তা চেয়ারম্যান হয়ে আসুক না কেন, তাকেই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট নানা কায়দায় প্রভাব বিস্তার করে। ক্ষমতাধর এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট কৃতকর্ম নিয়ে বিসিকের সকল কর্মকর্তা, কর্মচারীগণ এতটাই ভীতু যে তারা সব সময় বদলী ও প্রশাসনিক শাস্তির ভয়ে আতঙ্কে থাকেন।
এ ধরনের অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও তথ্য সন্ত্রাসের সাথে কে বা কারা যুক্ত, কাদের মদদ রয়েছে এবং কারাইবা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন সে বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে জানান দুর্নীতির নাটেরগুরু হলেন পরিচালক (প্রশাসন) খায়রুজ্জামান ও বিসিকের হিরো আলম খ্যাত ফরহাদ আহম্মেদ যিনি একাই বিসিকের সব পদের অধিকারী। বর্তমানে তিনি বিসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থাৎ অধ্যক্ষ পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আছেন। এছাড়া তিনি বিসিকের পরিকল্পনা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক, বিসিকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সচিব, বিভাগীয় নিয়োগ পদোন্নতি কমিটির সদস্য ও সিরোটসি ট্রাস্টের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর পদে আছেন। কৌশলবাজ ফরহাদ অল্প সময়ে চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করে তার চেয়ার ঠিক রাখছেন। অবৈধপন্থায় উপার্জিত অর্থ দুহাতে খরচ করে বর্তমান চেয়ারম্যানের অতিপছন্দের লোক বনে গেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে (বিসিক) এ ছায়া চেয়ারম্যান হিসেবে তার আবির্ভাব ঘটে। এই ছায়া চেয়ারম্যানের পরামর্শ বা মতামতেই চলতো যাবতীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম। ঘুষ, দুর্নীতি, বদলিসহ নানা রকম তদবিরের মাস্টারমাইন্ড কৌশলবাজ ড. মোঃ ফরহাদ আহম্মেদ। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনি পুরো বিসিক একাই নিয়ন্ত্রণ করে লুটপাট করেছেন। ফলে কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। আরও একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাবেক শিল্প মন্ত্রীর পিএস ও এপিএসের মাধ্যমে মন্ত্রীর কাছে ঘুষের টাকা নিয়মিত পৌঁছে দিতেন ফরহাদ আহম্মেদ। মন্ত্রী সিন্ডিকেটের সাথে ছিল দহরম মহরম সম্পর্ক। আর এই সম্পর্কের জোরে গোটা বিসিকে নিজের লুটপাটের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। সরকারী চাকুরী শৃংক্ষলাবিধি ভংগ করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দু’হাতে অবৈধ অর্থ উপার্জন এবং স্ত্রী আত্মীয় ও পরিবারের বিভিন্ন জনের নামে গড়েছেন সম্পদ। দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফুসে উঠেছে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
প্রকল্প পরিচালক জনাব মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান, পরিকল্পনা শাখার ডিজিএম মোহাম্মদ রাশেদুর রহমান, লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার হোসেন, মনিটরিং সেলের ম্যানেজার মেরাজ উদ্দিন, স্কিটির সহযোগী অনুষদ সদস্য আসিফ উল হাসান, ডিসিএ বিল মারুফ হাসান, একাউন্টস অফিসার জনাব আরিফ আলমগীরসহ অসাধু কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রধান কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে তাদের ইচ্ছাখুশি মত সরকারি অর্থ লুটপাট করে আসছেন। কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ লুটে তারা ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট, বাড়ী, গাড়ি, শপিংমলে দোকান এমনকি বিদেশেও টাকা পাচার করছেন। এই অসাধু কর্মকর্তাগণের প্ররোচনায় বিসিক চেয়ারম্যান সুকৌশলে বিসিকের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের মনোবল ভেংগে দেয়ার কাজটি করেছেন সহজেই। তারা বেনামী চিঠি (অভিযোগ) রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা সংস্থা, গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরসহ গণমাধ্যমে প্রেরণ করছেন। এরপর তারা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন একপেশে সংবাদ ছাপিয়ে সেগুলো রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ রাষ্ট্রিয় গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বিতরণ করছেন। বিসিকের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য উস্কানীমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে অসন্তোষ ও বিদ্বেষ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছেন। যা সরকারী কর্মচারী আচরণ বিধিমালার ২৭ ধারায় বর্নিত ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রন্থকরণ, এখতিয়ার বহির্ভুত কাজ সম্পাদন এবং ৩০এ ধারার (এ), (সি) উপধারার বিধান মতে সরকারী আদেশ বা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, বদলানো, সংশোধন এবং (ডি) ধারা লংঘন বা গুরুতর অসদাচরণ। এদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে বিসিক কর্তৃপক্ষ আসলে কী ব্যাখ্যা দেবে এখন জনমতে প্রশ্ন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে জানান যে, মোঃ সাইফুল ইসলাম চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়নের পর থেকে আজ পর্যন্ত স্বৈরাচারী মনোভাব দেখিয়ে সরকারের প্রচলিত আইন, বিধি বিধান, নিয়ম নীতির অপব্যাখ্যা করে বিসিকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে ক্ষতিগ্রস্থ করে আসছেন। তার প্রতিটি কর্মকান্ড স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে অসন্তোষ সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে ক্ষতিগ্রস্থ করে আনন্দ উপভোগ করেন এ কর্মকর্তা। বর্তমানে বিসিকে প্রায় ১৮০ জন আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ, ১৫০ জন দৈনিক মজুরি ভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ ও রাজস্বখাতের প্রায় ৫০০ কর্মকর্তা, কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান। নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার বানিজ্য করার পায়তারায় করছেন। আরও জানান অবসরে যাওয়ার আগে সহস্রাধিক পদে নিয়োগ সম্পন্ন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বিসিক চেয়ারম্যান মোঃ সাইফুল ইসলাম ও মহাক্ষমতাধর দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট বর্তমান কিছু কর্মকর্তা। নিয়োগকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিবের নামে চাকুরী প্রার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। চাকুরীপ্রার্থীদের আশঙ্কা রাতের আঁধারে নিয়োগ সম্পন্ন করতে পারেন বর্তমান চেয়ারম্যান, একের পর এক অনিয়ম সংঘটিত করে চলেছেন বিসিক চেয়ারম্যান।
সকল ধরনের সংকট ও অপরাধের সাথে জড়িত আছেন, এবং টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়াসহ বেনামে বিসিকের উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারী কাজের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি বিসিকের উন্নয়নের জন্য কোনো কাজই করেননি। কথায় কথায় তিনি কর্মচারিদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। সারাদিন স্কিটি, ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়সহ সারাদেশে বিভিন্ন ট্রেনিংয়ে ক্লাস নিয়ে টাকা কামাতে ব্যস্ত থাকেন আর সরকারী অর্থ খরচ করে সারাদেশে এমনকি বিদেশেও ভ্রমণ করতে থাকেন। তাকে ট্রেনিংয়ে ক্লাস দেয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হয় বিসিকের রাজস্ব খাত থেকে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের একমাত্র পোষক প্রতিষ্ঠানটি আজ ডুবতে বসেছে। প্রতিষ্ঠানটি আজ দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য আর অদক্ষদের স্বর্গে পরিণত হয়েছে। চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীরদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, কর্মচারীদের স্বার্থবিরোধী কার্য সম্পাদন, বিসিক নামীয় প্রতিষ্ঠানটির শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অশান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
মহাক্ষমতাধর দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের নাটেরগুরু পরিচালক (প্রশাসন) খায়রুজ্জামান সরকারী নিয়ম নীতির কোন তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামাফিক ভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। নির্যাতন ও হয়রানীমূলক বদলীর মাধ্যমে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন। অহেতুক ফাইল আটকিয়ে রাখার ডজন ডজন নজির রয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিসিকের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় টেলিফোনে চাকরি প্রত্যাশী ব্যক্তির নিকট টাকা চাওয়ায় অসাধু চক্রের অন্যতম সদস্য পরিচালক (প্রশাসন) এর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। অনুসন্ধানে জানা গেছে নিয়োগ, বদলী, পদোন্নতি ও দাপ্তরিক কেনাকাটায় মোটা উৎকোচ আদায় করেন তিনি। উক্ত টাকা না দিলে নানান টাল বাহানা করে ফাইল আটকিয়ে রাখে। সিন্ডিকেট চেয়ারম্যানের আস্কারায় সে কোন বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে মাসের পর মাস ফাইল আটকিয়ে উৎকোচ আদায় করে থাকে। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান কে জানালেও তিনি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিষয়টি পানির মতো পরিস্কার হয়ে যায় যে চেয়ারম্যানের আশীর্বাদেই সে এইসব অপকর্মের সুযোগ পেয়েছেন।
সম্প্রতি ৩০ জুন ২০২৫ তারিখ ৩৬.০২.০০০০.০০৩.১২.০৩২.২৫. ১৪৬৮ নং স্মারকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি প্রাপ্ত কর্মকর্তাগণকে নিদারুন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হচ্ছে। পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়েও তারা এখনও কাজ করছেন নিচের পদের চেয়ারে বসে। পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পুনরাদেশ না দেয়া পর্যন্ত স্বস্ব কর্মস্থলে অবস্থান করে দায়িত্ব পালনের আদেশ জারী করা হয়। এখন পর্যন্ত তাদের ক্ষেত্রে পদায়ন আদেশ জারী করা হয়নি। বিসিক পরিচালক প্রশাসনের এ ধরনের কার্যক্রম সরকারী দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার সাথে মানসিক অসন্তোষ তৈরীর অন্যতম কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে তার স্বৈরাচারী মনোভাবেরও প্রমাণ বহন করে। দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন বিসিক নামক প্রতিষ্ঠানটিতে। বিসিকে কর্মরত অধিকাংশ কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য, কেননা তারা এই মহাক্ষমতাধর দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের উস্কানীমূলক আচরণ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এবং ধৈয্যের সাথে মোকাবেলা করে চলেছেন। এসমস্ত বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের সাথে দেখা করতে গিয়ে অফিসে পাওয়া যায়নাই। মুঠোফোনে কর্মকর্তা, কর্মচারী অসন্তোষ, অনিয়ম এবং দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন আমি এখন কক্সবাজারে একটি অনুষ্ঠানে আছি পরবর্তীতে যোগাযোগ করা হবে বলে আর যোগাযোগ করেননি।











