১১:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

১৫০ বছরে অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়: আলোর মঞ্চে উৎসব, আড়ালে উপেক্ষিত শিক্ষাগুরুদের আত্মা

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট: ০৬:০৮:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৩৫

১৫০ বছরে অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়: আলোর মঞ্চে উৎসব, আড়ালে উপেক্ষিত শিক্ষাগুরুদের আত্মা

কাজী আরিফ
প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া

একটি বিদ্যালয়ের বয়স যখন দেড় শতাব্দী ছুঁয়ে ফেলে, তখন সেটি আর কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে না—তা হয়ে ওঠে ইতিহাস, উত্তরাধিকার ও জাতি গঠনের এক নীরব কারখানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ঠিক তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি প্রাঙ্গণ বহন করে শত শত শিক্ষাগুরুর ঘাম, ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্মৃতি।২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫—দুই দিনব্যাপী ১৫০ বছর পূর্তি উদযাপন হলো জাঁকজমকভাবে। আলো, মাইক, ব্যানার, মঞ্চ—সবই ছিল।কিন্তু ছিল না যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই এই বিদ্যালয়ের জন্মকথা সম্পূর্ণ হয়—সেই শিক্ষাগুরুদের প্রতি প্রাপ্য সম্মান।যাঁরা আলো জ্বেলেছিলেন, আজ তাঁদের নামেই অন্ধকার ওয়াহিদুল নবী খান, ইসমাইল হোসেন খান, আবেদ হোসেন, নাসির উদ্দিন, নুরুল হুদা, আবু সাঈদ, রাধা চরণ রায়, নাজির হোসেন, নুর আহাম্মদ, মহিবুল্লাহ, সাআদত খান, নৃপেন্দ্র ভৌমিক, ইয়াকুব আলি, আবু বক্কর সিদ্দিক, আহসানুল্লাহ—
এই নামগুলো কোনো তালিকা নয়, এরা অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের আত্মা।
আজ তাঁদের অধিকাংশই আর জীবিত নেই। কিন্তু তাঁদের সন্তান, নাতি-নাতনিরা বেঁচে আছেন।অভিযোগ উঠেছে—এই মহান শিক্ষাগুরুদের পরিবারগুলোর কাউকেই ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি কয়েকজন প্রয়াত শিক্ষকের সন্তানকে রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয়েছে।
প্রশ্ন জাগে—এ কোন শিক্ষা? এ কোন মূল্যবোধ?উৎসব নয়, শ্রদ্ধাই ছিল প্রথম প্রয়োজন একজন প্রবীণ সাবেক শিক্ষার্থীর কণ্ঠে শোনা যায় চাপা ক্ষোভ—“এই অনুষ্ঠান শুরু হওয়া উচিত ছিল দোয়া মাহফিল দিয়ে, কবর জিয়ারতের মাধ্যমে। শিক্ষাগুরুদের নামে সম্মাননা ক্রেস্ট দিয়ে। তাঁদের পরিবারের হাত ধরে মঞ্চে তুলে এনে।”অন্য একজন শিক্ষার্থী আরও কঠোর ভাষায় বলেন—“এটা উৎসব নয়, এটা বাণিজ্য। এখানে ইতিহাস বিক্রি হয়েছে টিকিটের দামে।”এই কথাগুলো কেবল আবেগ নয়, এগুলো একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক পরাজয়ের সাক্ষ্য।লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ গড়া মানুষগুলো কি আজ অপ্রাসঙ্গিক?অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ দেশ গড়ার কাজে যুক্ত হয়েছেন—কেউ শহীদ হয়েছেন, কেউ প্রশাসক, কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক।কিন্তু যাঁরা তাঁদের মানুষ বানিয়েছেন, সেই শিক্ষাগুরুদের নাম কি আজ কেবল পুরোনো রেজিস্টারে বন্দী?একটি বিদ্যালয়ের শতবর্ষী ইতিহাস যদি কেবল ব্যানারে সীমাবদ্ধ থাকে,যদি কৃতজ্ঞতার জায়গায় হিসাবের খাতা বসে,তবে সেই ইতিহাস জীবিত থাকে না—শুধু প্রদর্শনী হয়।এখনো সময় আছে—ভুল স্বীকারই বড় শিক্ষা,এই সম্পাদকীয় কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে নয়।এটি একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর—যারা মনে করে,শিক্ষাগুরুদের সম্মান ছাড়া কোনো উৎসব পূর্ণ হয় না।এখনো সময় আছে—প্রয়াত শিক্ষাগুরুদের নামে স্মরণসভা আয়োজনের,তাঁদের পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রীয় সম্মানে আমন্ত্রণ জানানোর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্থায়ী স্মৃতিফলক নির্মাণের আর সবচেয়ে বড় কথা—ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার কারণ,শিক্ষা মানে কেবল ভবিষ্যৎ নয়—শিক্ষা মানে অতীতের প্রতি দায়বদ্ধতা।অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় যদি সত্যিই ১৫০ বছর পূর্ণ করে থাকে,তবে এই দায় স্বীকার করাটাই হোক তার সবচেয়ে বড় অর্জন।

Please Share This Post in Your Social Media

বিজ্ঞাপন: ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট এর জন্য যোগাযোগ করুন: ০১৮২৪৯০৯০১০
বিজ্ঞাপন: ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট এর জন্য যোগাযোগ করুন: ০১৮২৪৯০৯০১০

১৫০ বছরে অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়: আলোর মঞ্চে উৎসব, আড়ালে উপেক্ষিত শিক্ষাগুরুদের আত্মা

আপডেট: ০৬:০৮:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫

১৫০ বছরে অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়: আলোর মঞ্চে উৎসব, আড়ালে উপেক্ষিত শিক্ষাগুরুদের আত্মা

কাজী আরিফ
প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া

একটি বিদ্যালয়ের বয়স যখন দেড় শতাব্দী ছুঁয়ে ফেলে, তখন সেটি আর কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে না—তা হয়ে ওঠে ইতিহাস, উত্তরাধিকার ও জাতি গঠনের এক নীরব কারখানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ঠিক তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি প্রাঙ্গণ বহন করে শত শত শিক্ষাগুরুর ঘাম, ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্মৃতি।২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫—দুই দিনব্যাপী ১৫০ বছর পূর্তি উদযাপন হলো জাঁকজমকভাবে। আলো, মাইক, ব্যানার, মঞ্চ—সবই ছিল।কিন্তু ছিল না যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই এই বিদ্যালয়ের জন্মকথা সম্পূর্ণ হয়—সেই শিক্ষাগুরুদের প্রতি প্রাপ্য সম্মান।যাঁরা আলো জ্বেলেছিলেন, আজ তাঁদের নামেই অন্ধকার ওয়াহিদুল নবী খান, ইসমাইল হোসেন খান, আবেদ হোসেন, নাসির উদ্দিন, নুরুল হুদা, আবু সাঈদ, রাধা চরণ রায়, নাজির হোসেন, নুর আহাম্মদ, মহিবুল্লাহ, সাআদত খান, নৃপেন্দ্র ভৌমিক, ইয়াকুব আলি, আবু বক্কর সিদ্দিক, আহসানুল্লাহ—
এই নামগুলো কোনো তালিকা নয়, এরা অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের আত্মা।
আজ তাঁদের অধিকাংশই আর জীবিত নেই। কিন্তু তাঁদের সন্তান, নাতি-নাতনিরা বেঁচে আছেন।অভিযোগ উঠেছে—এই মহান শিক্ষাগুরুদের পরিবারগুলোর কাউকেই ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি কয়েকজন প্রয়াত শিক্ষকের সন্তানকে রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয়েছে।
প্রশ্ন জাগে—এ কোন শিক্ষা? এ কোন মূল্যবোধ?উৎসব নয়, শ্রদ্ধাই ছিল প্রথম প্রয়োজন একজন প্রবীণ সাবেক শিক্ষার্থীর কণ্ঠে শোনা যায় চাপা ক্ষোভ—“এই অনুষ্ঠান শুরু হওয়া উচিত ছিল দোয়া মাহফিল দিয়ে, কবর জিয়ারতের মাধ্যমে। শিক্ষাগুরুদের নামে সম্মাননা ক্রেস্ট দিয়ে। তাঁদের পরিবারের হাত ধরে মঞ্চে তুলে এনে।”অন্য একজন শিক্ষার্থী আরও কঠোর ভাষায় বলেন—“এটা উৎসব নয়, এটা বাণিজ্য। এখানে ইতিহাস বিক্রি হয়েছে টিকিটের দামে।”এই কথাগুলো কেবল আবেগ নয়, এগুলো একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক পরাজয়ের সাক্ষ্য।লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ গড়া মানুষগুলো কি আজ অপ্রাসঙ্গিক?অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ দেশ গড়ার কাজে যুক্ত হয়েছেন—কেউ শহীদ হয়েছেন, কেউ প্রশাসক, কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক।কিন্তু যাঁরা তাঁদের মানুষ বানিয়েছেন, সেই শিক্ষাগুরুদের নাম কি আজ কেবল পুরোনো রেজিস্টারে বন্দী?একটি বিদ্যালয়ের শতবর্ষী ইতিহাস যদি কেবল ব্যানারে সীমাবদ্ধ থাকে,যদি কৃতজ্ঞতার জায়গায় হিসাবের খাতা বসে,তবে সেই ইতিহাস জীবিত থাকে না—শুধু প্রদর্শনী হয়।এখনো সময় আছে—ভুল স্বীকারই বড় শিক্ষা,এই সম্পাদকীয় কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে নয়।এটি একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর—যারা মনে করে,শিক্ষাগুরুদের সম্মান ছাড়া কোনো উৎসব পূর্ণ হয় না।এখনো সময় আছে—প্রয়াত শিক্ষাগুরুদের নামে স্মরণসভা আয়োজনের,তাঁদের পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রীয় সম্মানে আমন্ত্রণ জানানোর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্থায়ী স্মৃতিফলক নির্মাণের আর সবচেয়ে বড় কথা—ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার কারণ,শিক্ষা মানে কেবল ভবিষ্যৎ নয়—শিক্ষা মানে অতীতের প্রতি দায়বদ্ধতা।অন্নদা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় যদি সত্যিই ১৫০ বছর পূর্ণ করে থাকে,তবে এই দায় স্বীকার করাটাই হোক তার সবচেয়ে বড় অর্জন।